বাংলা আর্টিকেল
ইসলামের ইতিহাসে যে সকল নবী-রাসূলগণের আগমন ঘটেছে, তাঁদের মধ্যে হযরত ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তিনি কেবল একজন নবীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ‘উলুল আযম’ বা দৃঢ়সংকল্প নবীদের একজন এবং আল্লাহ তাঁকে ‘খলিলুল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর বন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলাম—এই তিনটি প্রধান আব্রাহামিক ধর্মের অনুসারীদের কাছে তিনি পিতা হিসেবে সম্মানিত। পবিত্র কুরআনে তাঁর নাম ৬৯ বার উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে ঈমান, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
জন্ম ও মূর্তিপূজার বিরোধিতা
হযরত ইবরাহিম (আঃ) প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) 'উর' নামক এক সমৃদ্ধ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আযর ছিলেন একজন বিখ্যাত মূর্তিনির্মাতা এবং তাঁর সমাজ ছিল মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত। ছোটবেলা থেকেই ইবরাহিম (আঃ) এই শিরকের বিরোধিতা করতেন। তিনি তাঁর স্বচ্ছ ও যুক্তিশীল মন দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই হাতে গড়া মূর্তিগুলো কোনোভাবেই উপাসনার যোগ্য হতে পারে না। তারা কথা বলতে পারে না, শুনতে পায় না এবং কারো উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতাও তাদের নেই।
তিনি প্রথমে তাঁর পিতাকে এবং তারপর তাঁর জাতিকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান। কুরআনে তাঁর ও তাঁর পিতার কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে:
"স্মরণ কর, যখন ইবরাহিম তার পিতা আযরকে বলল, ‘আপনি কি প্রতিমাগুলোকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে এবং আপনার সম্প্রদায়কে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় দেখছি’।" (সূরা আল-আনআম, ৬:৭৪)
তিনি তাঁর জাতিকে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তিনি চন্দ্র, সূর্য এবং তারকারাজিকে দেখিয়ে বলেন যে, এগুলো সবই পরিবর্তনশীল এবং অস্তগামী, সুতরাং এগুলো সৃষ্টিকর্তা হতে পারে না। সৃষ্টিকর্তা তো তিনিই, যিনি এই সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তাঁর জাতি তাঁর কথা শুনল না, বরং তারা তাঁর প্রতি আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।
অগ্নিপরীক্ষা: আল্লাহর উপর চূড়ান্ত ভরসা
জাতির লোকেরা যখন তাদের এক উৎসব উপলক্ষে শহরের বাইরে গিয়েছিল, তখন ইবরাহিম (আঃ) তাদের উপাসনালয়ে প্রবেশ করেন। তিনি সবচেয়ে বড় মূর্তিটি ছাড়া বাকি সবগুলোকে ভেঙে ফেলেন এবং কুড়ালটি বড় মূর্তির কাঁধে ঝুলিয়ে রেখে আসেন। লোকেরা ফিরে এসে এই অবস্থা দেখে প্রচণ্ড রেগে যায় এবং বুঝতে পারে যে এটি ইবরাহিম (আঃ) এর কাজ।
তারা তাঁকে রাজা নমরূদের সামনে হাজির করে। নমরূদ ছিল তৎকালীন এক অহংকারী ও অত্যাচারী শাসক, যে নিজেকে খোদা দাবি করত। ইবরাহিম (আঃ) নির্ভীকভাবে নমরূদের সামনে এক আল্লাহর অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো কে মূর্তিগুলো ভেঙেছে, তিনি উত্তরে বললেন, "বরং এই বড় মূর্তিটিই তো একাজ করেছে। এদেরকেই জিজ্ঞেস কর, যদি এরা কথা বলতে পারে।" (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৬৩)। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিবেককে জাগ্রত করা যে, এই মূর্তিগুলো কতটা অসহায়।
এই যুক্তিতে পরাজিত হয়ে তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং ইবরাহিম (আঃ)-কে আগুনে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হয় এবং তাঁকে মিনজানিক (ক্যাটাপুল্ট) এর মাধ্যমে সেই আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু আল্লাহ তাঁর বন্ধুকে রক্ষা করেন।
"আমি বললাম, ‘হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও’।" (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৬৯)
আগুন তাঁর একটি পশমও স্পর্শ করতে পারেনি। এই অলৌকিক ঘটনাটি ছিল আল্লাহর প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাস এবং তাওয়াক্কুলের এক সুস্পষ্ট প্রতিদান।
হিজরত এবং পুত্র ইসমাঈল (আঃ) এর কুরবানি
জাতির কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর, আল্লাহ ইবরাহিম (আঃ)-কে তাঁর স্ত্রী সারা এবং ভাতিজা লূত (আঃ)-কে নিয়ে জন্মভূমি ত্যাগ করে হিজরত করার নির্দেশ দেন। তিনি ফিলিস্তিন, মিশর এবং অবশেষে মক্কায় বসতি স্থাপন করেন।
বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাঁকে দুটি পুত্র সন্তান দান করেন: ইসমাঈল (আঃ), যিনি হাজেরা (আঃ) এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন, এবং ইসহাক (আঃ), যিনি সারা (আঃ) এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাঁর শিশুপুত্র ইসমাঈল এবং তাঁর মা হাজেরাকে মক্কার জনমানবহীন মরু প্রান্তরে রেখে আসেন। এটি ছিল তাঁর জন্য আরেকটি কঠিন পরীক্ষা, কিন্তু তিনি আল্লাহর নির্দেশের উপর безоговорочно আস্থা স্থাপন করেন।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি আসে যখন ইসমাঈল (আঃ) কিশোর বয়সে উপনীত হন। ইবরাহিম (আঃ) স্বপ্নে দেখেন যে তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে কুরবানি করছেন। নবীদের স্বপ্নও ছিল এক ধরনের ওহী। তিনি বিষয়টি তাঁর পুত্রকে জানালে, ইসমাঈল (আঃ) বলেন:
"হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।" (সূরা আস-সাফফাত, ৩৭:১০২)
পিতা-পুত্রের এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং ত্যাগের মহিমায় আল্লাহ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। যখন ইবরাহিম (আঃ) তাঁর পুত্রকে কুরবানি করতে উদ্যত হন, তখন আল্লাহ তাঁকে থামিয়ে দেন এবং তাঁর পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানি করার ব্যবস্থা করে দেন। এই মহান ত্যাগের স্মরণে মুসলিমরা প্রতি বছর ঈদুল আযহা উদযাপন করে।
কাবা ঘর নির্মাণ
আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহিম (আঃ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) মক্কায় পবিত্র কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ করেন। এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম ইবাদতখানা, যা এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত হয়েছিল। তাঁরা যখন কাবা ঘরের দেয়াল তুলছিলেন, তখন তাঁরা দোয়া করছিলেন:
"হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১২৭)
কাবা ঘর নির্মাণ শেষে আল্লাহ ইবরাহিম (আঃ)-কে হজ্জের ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মুসলিম প্রতি বছর আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করতে এবং হজ্জ পালন করতে মক্কায় সমবেত হয়, যা ইবরাহিম (আঃ) এর দাওয়াতের বিশ্বজনীন সফলতার এক জীবন্ত নিদর্শন।
উপসংহার
হযরত ইবরাহিম (আঃ) এর জীবন ছিল আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস, অকল্পনীয় ত্যাগ, এবং নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক মূর্ত প্রতীক। তিনি আমাদের শেখান কীভাবে শিরকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষায় আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হয়, এবং কীভাবে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দিতে হয়। তাঁর জীবন কাহিনী যুগ যুগ ধরে মুমিনদের জন্য অনুপ্রেরণার এক অন্তহীন উৎস হয়ে থাকবে।