Aid Islam LogoAid Islam

বাংলা আর্টিকেল

রমজানের গুরুত্ব, ফজিলত এবং আমল
প্রায় ১৭ মিনিট পঠন
রমজান, রোজা, তাকওয়া, কুরআন
খোলা বই

রমজান মাস ইসলামী হিজরি ক্যালেন্ডারের নবম মাস এবং বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের জন্য এটি বছরের সবচেয়ে পবিত্র ও মহিমান্বিত একটি মাস। এটি শুধু উপবাসের মাস নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক উন্নতি, সংযম, ধৈর্য এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অসাধারণ সুযোগ। এই মাসে মুসলিমরা সাওম বা রোজা পালন করে, যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। রমজান মাসকে রহমত (আল্লাহর করুণা), মাগফিরাত (ক্ষমা) এবং নাজাত (জাহান্নাম থেকে মুক্তি)—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়, যা এর অসীম গুরুত্ব ও ফজিলতকে তুলে ধরে।

রমজানের ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় গুরুত্ব

রমজান মাসের গুরুত্বের প্রধান এবং অন্যতম কারণ হলো, এই মাসেই মানবজাতির জন্য হেদায়েতের চূড়ান্ত উৎস পবিত্র কুরআন নাযিল হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট প্রমাণাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

এই মাসেই রয়েছে ‘লাইলাতুল কদর’ বা কদরের রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ তা'আলা এই রাত সম্পর্কে বলেন, "নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাযিল করেছি কদরের রাতে। আর আপনি কি জানেন, কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।" (সূরা আল-কদর, ১-৩)। এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাস বা ৮৩ বছরের বেশি সময় ধরে ইবাদত করার সমতুল্য, যা রমজানের ফজিলতকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

রোজার মূল উদ্দেশ্য ও উপকারিতা

রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। তাকওয়া মানে হলো আল্লাহর ভয়ে এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সকল প্রকার পাপ ও মন্দ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। সারাদিন পানাহার, জৈবিক চাহিদা এবং অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে একজন মুসলিম তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্য ও ভালোবাসার চূড়ান্ত পরীক্ষা দেয়।

রোজার বহুবিধ উপকারিতা রয়েছে, যা আধ্যাত্মিক, শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক—সব ক্ষেত্রেই বিস্তৃত।

  • আধ্যাত্মিক উন্নতি: রোজা আল্লাহর প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি করে, ইবাদতে গভীরতা ও একাগ্রতা নিয়ে আসে। এই মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, ফলে ইবাদত করা এবং পাপ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।
  • আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ও ধৈর্য: রোজা ধৈর্য, সংযম এবং ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করে। এটি একজন মানুষকে শেখায় কীভাবে নিজের আবেগ ও চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
  • সহানুভূতি ও সমবেদনা: ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল মুসলিম রোজা রাখার মাধ্যমে ক্ষুধার কষ্ট অনুধাবন করতে পারে। এর ফলে গরিব ও অভুক্ত মানুষের প্রতি তাদের মনে সহানুভূতি ও সমবেদনা তৈরি হয়, যা তাদেরকে দান-সদকা করতে উৎসাহিত করে।
  • শারীরিক উপকারিতা: আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, নিয়ন্ত্রিত উপবাস বা Intermittent Fasting স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি শরীরকে ডিটক্স বা বিষমুক্ত করে, হজম প্রক্রিয়াকে বিশ্রাম দেয়, শরীরের কোষ মেরামত করে এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

রমজান মাসে করণীয় বিশেষ আমলসমূহ

রমজান মাস হলো ইবাদতের বসন্তকাল। এই মাসে ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল ইবাদতের সওয়াবও বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই মুসলিমরা এই মাসে বেশি বেশি ইবাদত করার চেষ্টা করে।

  1. কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন: যেহেতু এই মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, তাই এই মাসে বেশি বেশি কুরআন পড়া, এর অর্থ বোঝা এবং তা নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
  2. তারাবীহ-এর নামাজ: এশার নামাজের পর তারাবীহ-এর নামাজ পড়া রমজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। জামায়াতের সাথে তারাবীহ পড়া রমজানের রাতের অন্যতম সেরা আমল।
  3. দান-সদকা করা: রাসূল (সাঃ) রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি দানশীল হতেন। এই মাসে দান করলে অন্য মাসের চেয়ে অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।
  4. ইতিকাফ করা: রমজানের শেষ দশকে দুনিয়াবী কাজকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। এটি একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নত, যার মাধ্যমে লাইলাতুল কদর তালাশ করা সহজ হয়।
  5. দোয়া ও ইস্তেগফার: রমজান মাস দোয়া কবুলের মাস। বিশেষ করে ইফতার ও সাহরির সময় এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন, গুনাহ মাফ এবং কল্যাণের জন্য দোয়া করা উচিত।
  6. লাইলাতুল কদর অন্বেষণ: রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯) লাইলাতুল কদর তালাশ করা উচিত এবং এই রাতগুলোতে সারারাত জেগে ইবাদত করা উত্তম।
  7. যাকাতুল ফিতর আদায় করা: ঈদের নামাজের আগে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের পক্ষ থেকে গরিব-মিসকিনদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য বা তার সমমূল্য অর্থ প্রদান করা ওয়াজিব, যা যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা নামে পরিচিত। এটি রোজার ভুল-ত্রুটির কাফফারা হিসেবে কাজ করে এবং ঈদের দিন গরিবদের আনন্দের অংশীদার করে।

রমজান থেকে আমাদের শিক্ষা

রমজান মাস মুসলিমদের জন্য একটি প্রশিক্ষণের মাস। এই এক মাস ধরে অর্জিত তাকওয়া, ধৈর্য, সংযম ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ যদি বাকি এগারো মাস ধরে রাখা যায়, তবেই রমজানের আসল উদ্দেশ্য সফল হবে। রমজান আমাদের শেখায় কীভাবে কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে আল্লাহর আনুগত্যের জীবনযাপন করতে হয়। এটি আমাদের আরও ভালো মানুষ, আরও ভালো মুসলিম হতে সাহায্য করে।

উপসংহার

রমজান কেবল একটি মাসব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি জীবন পরিবর্তনকারী অভিজ্ঞতা যা আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং আমাদেরকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়। এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। তাই আমাদের উচিত এই মাসের প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত বোঝার এবং সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।